হিজরি বর্ষ সমাপ্তি উপলক্ষে ওয়াজ নসিহতের বিধান - www.islamerpath.wordpress.com

হিজরি বর্ষ সমাপ্তি উপলক্ষে ওয়াজ নসিহতের বিধান

বর্ষ শেষে দেখা যায় বিভিন্ন মসজিদের খতীব, ওয়ায়েজ, অনেক আলেম ও লেখকগণ বয়ান-বক্তৃতা, লেখনি ও ইলেক্ট্রনিক নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে ওয়াজ-নসিহত ও উপদেশ প্রদান আরম্ভ করেন। তারা বর্ষ শেষ, দুনিয়ার সমাপ্তি ও ধ্বংসের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। বিগত বৎসরের মোহাসাবা তথা আত্মসমালোচনার জন্য বলেন। নতুন বৎসরে, নব উদ্যমে নেককাজ করার প্রত্যয় গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন।

তবে, কুরআন, হাদিস ও শরিয়তের বিধান অনুসারে এ সময়কে বিশেষ ওয়াজ-নসিহতের জন্য মনোনীত করা এবং মানুষকে এ মুহূর্তে তওবা, আমলে সালেহ, সদকা, আত্মসমালোচনা ও ভুল-ত্র“টির জন্য অন্যদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়ার উপদেশ দেয়া ইত্যাদি সিদ্ধ নয়। বিভিন্ন কারণে এটা সুন্নত তো নয়-ই বরং বেদআত।

১.       রাসূল সা. এবং সাহাবায়ে কেরাম বা যার কথা গ্রহণ করা যায় এমন কোন ইমাম থেকে এ সময়কে তওবা ও আমলে সালেহ’র জন্য বিশিষ্ট করার প্রমাণ নেই।

২.       কুরআন, হাদিস ও শরিয়তের বিধান অনুসারে হিজরি বৎসর সমাপ্তিকাল ধর্মীয় কোন উপলক্ষ্য নয়, যাতে নির্দিষ্ট আমল অনুমোদিত বা কোন নেকআমলের সওয়াব বৃদ্ধি করা হয়। হ্যাঁ, শরিয়ত কিছু উপলক্ষকে শ্রেষ্টত্ব দিয়েছে এবং তাতে নেকআমল করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে। যেমন আশুরা, রমজান, শাওয়াল ও জিলহজ মাসের প্রথম দশ তারিখ ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত : বর্ষ সমাপ্তির ব্যাপারে এমন বক্তব্যও আসেনি যে, তাতে বান্দার আমলের একটি অধ্যায় পূর্ণ হয় বা তাতে বান্দার আমল আসমানে উঠানো হয়। যার এমন ধারণা সে ভুলে নিপতিত এবং সে এমন জিনিসকে ধর্মের অন্তর্ভুক্ত মনে করল, যা ধর্মের কোন জিনিস নয়। তবে, দলিল দ্বারা যা প্রমাণিত, তা হচ্ছে সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবার এবং দিনের ফজর সালাতের সময় ও আসর সালাতের সময় বান্দার আমল ঊর্ধ্বে উঠানো হয়। আরেকটি বর্ণনায় আছে, বৎসরের শাবান মাসেও বান্দার আমল ঊর্ধ্বে উঠানো হয়। তৃতীয়ত : মুমিন বান্দার আমল নামা তখনই বন্ধ হয়, যখন তার মৃত্যু হয় ও আল্লাহ তাকে উঠিয়ে নেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হল যে, হিজরি বর্ষের সমাপ্তি ও বান্দার আমলের সমাপ্তির সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই।

৩.      হিজরি বৎসর নির্দিষ্ট করণ ও তার সমাপ্তি রাসূল নির্ধারণ করেননি, এমনকি আবুবকরও না। তবে মুসলমানদের প্রয়োজন, পার্থিব স্বার্থ ও তাদের আমলের প্রয়োজনের ভিত্তিতে ওমর রা. তা উদ্ভাবন করেছেন। আর সাহাবায়ে কেরাম তা অনুমোদন দিয়েছেন। এর দ্বারাই প্রমাণিত হয় যে শরিয়ত বর্ষ সমাপ্তি ও তার মাঝে কোন আমল নির্ধারণ করেনি।

৪.       প্রত্যেক মানুষের বৎসর শুরু হয় তার জন্মের দিন থেকে। পরের বৎসর যখন সে দিন আবার ফিরে আসে তখন তার বৎসর পূর্ণ হয়। আর এদিনটির মাধ্যমে তার বৎসর শুরু হয় ও শেষ হয়, অথচ তা হিজরি বৎসরের শুরু বা শেষ নয়। কারো বৎসর শুরু হয় মহররম মাসে আবার কারো বৎসর শুরু হয় সফর মাসে এভাবেই চলছে। অতএব প্রত্যেক মানুষের বৎসর শুরু শেষ হিজরি বৎসর হিসেবে গণনা করা ভুল, আর এতে কোন ফায়দাও নেই।

৫.       এসব মওসুমকে ধর্মীয় জ্ঞান করা এবং এতে কোন নেকআমল নির্দিষ্ট করা মূলত বেদআতের জন্ম দেয়া ও শরিয়ত নির্ধারিত দিনের মধ্যে পরিবর্তন আনা বৈ কিছু নয়। এভাবে আমরা যদি বৎসর সমাপ্তি, হিজরতের দিন, ইসরা ও মেরাজের দিন এবং রাসূলের জন্ম দিনকে বিশেষ আমল ও কর্মকান্ডের জন্য নির্ধারণ করি ও তার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করি, তবে মনে রাখতে হবে, আমরা নিজদের জন্য গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতার দ্বার উম্মুক্ত করে দিলাম। শরিয়তের নিদর্শনের মধ্যে পরিবর্তন আনলাম এবং শরিয়ত নির্ধারিত মওসুমকে পরিবর্তন করে স্বয়ং শরিয়তের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হলাম। অথচ শরিয়ত এসেছে এবাদত ও কুসংস্কারের মাঝে পার্থক্য করার জন্য, ইসলামিক উপলক্ষ্য ও অনৈসলামিক উপলক্ষ্যের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি, এর প্রতি গুরুত্বারোপ করা একান্ত কর্তব্য। এ জন্য ইমাম মালেক রহ. ও অন্যান্য ইমামগণ ইসলাম ধর্মকে বেদআত, কুসংস্কার ও গর্হিত কাজকর্ম থেকে হিফাজত করার জন্য এর প্রতি খুব গুরুত্বারোপ করতেন।

অতএব ইমাম, খতিব, দায়ী ও আলেমগণের উচিত এ দিনে তওবা, আমলে সালেহ ও মুহসাবার প্রতি জনগণকে উদ্বুদ্ধ না করা। বিশেষ কোন জিনিস এ দিনে সম্পাদন না করা। এবং বৎসরের শেষ জুমার প্রতি বিশেষ কোন গুরুত্বারোপ না করা। কারণ এ দিনগুলোর বিশেষ কোন ফজিলত নেই, বরং বৎসরের অন্যান্য দিনের মত এ দিনগুলোও একই কাতারের। আর তওবা, আমলে সালেহ ও মুহাসাবা বৎসরের সব সময় করা যায়।

হ্যাঁ, যদি উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের একটি উপযুক্ত সময় হিসেবে এ মুহূর্তটিকে গ্রহণ করা হয় এবং কোন জিনিস বিশেষভাবে এতে উদ্যাপন না করা হয় তবে ভিন্ন কথা। যেমন বর্ষ শেষ হওয়ার দ্বারা যদি দুনিয়ার সমাপ্তি ও মুমিনের মৃত্যুর কথা স্বরণ করিয়ে দেয়া হয় এবং আরো স্বরণ করিয়ে দেয়া হয় যে, সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না, এর মুল্যায়ণ করা প্রয়োজন, তবে কোন সমস্যা নেই। যদি একে সুন্নত মনে না করা হয় এবং এর প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা না হয়। কারণ ওয়াজ-নসিহতের দরজা সব সময়ের জন্য উন্মুক্ত। বিশেষভাবে ও সাধারণভাবে বৎসরের প্রতিটি দিন এর জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এর জন্য কোন দলিলের প্রয়োজন নেই। রাসূল সা. বিশেষ বিশেষ মুহূর্তকে ওয়াজ-নসিহতের জন্য সুবর্ণ সুযোগ মনে করতেন। এ ব্যাপারে আমাদের আদর্শ পূর্বসুরিদের থেকেও অনেক উক্তি-প্রবাদ বর্ণিত রয়েছে। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমীন।

PDF আকারে ডাউনলোড করুন

আরো পোস্ট পেতে এখানে ক্লিক করুন
_______________________________________________
হিজরি বর্ষ সমাপ্তি উপলক্ষে ওয়াজ নসিহতের বিধান
লেখক : সানাউল্লাহ নিজর আহমদ
সম্পাদনা : কাউসার বিন খালিদ
ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ
কৃতজ্ঞতায় : ইসলাম হাউস

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s