নববর্ষ দ্যূতিময় আগামীর নতুন প্রেরণা - www.islamerpath.wordpress.com

নববর্ষ দ্যূতিময় আগামীর নতুন প্রেরণা

বিদায় নিল স্মৃতি বিজড়িত বর্ণিল কতগুলো দিন। সমাপ্ত হল একটি বছর। সূচনা হল আরেকটি বছরের। একটি রাতের প্রান্তে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ আনন্দিত হয় একটি নতুন ভোর আসবে বলে, প্রভাতে নতুন এক সূর্য উদিত হবে বলে। কিন্তু আমার অনুভূতি একটু ব্যতিক্রম। বছর শেষে নতুন আরেকটি বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য আমি আনন্দ উল্লাস করতে পারি না। আমার অনুভূতি হলো, যে দিনগুলো শেষ হয়ে গেল তা তো আমার জীবনেরই একটি অংশ। কবি বলেন-

يسر الناس ما ذهب الليالي * ولكن ذهابهن له ذهاباً .

দিবস-রজনীর আগমন-প্রস্থান মানুষকে আনন্দ দেয়, অথচ চলে যাওয়া দিনগুলো যে তাদের জীবনেরই বিদায়ী বার্তা।

একটি বছরের সাথে কেমন যেন আমার জীবন নামক প্রাসাদ থেকে ৩৬৫ দিনের ৩৬৫ টি পাথর খসে পড়ল। আমার জীবন ছোট হয়ে এল। আমার জন্য এ তো আনন্দের ব্যাপার নয়। বরং এটি আমার চিন্তার কারণ। বিগত বছরটি কিভাবে কাটিয়েছি ? আগামী বছর কিভাবে কাটাব ? আমার অর্জন কি ? আরো কত প্রশ্ন!
এখন আমার আনন্দ-উল্লাসের এতটুকু ফুরসত নেই। এখন শুধু হিসাব-নিকাশ মিলানোর সময়। দ্বিতীয় খলিফা উমর রা. এর একটি বাণী বার বার মনে পড়ে। তিনি বলেন,

حاسبوا أنفسكم قبل أن تحاسبوا، وزنوا أعمالكم قبل أن توزنوا، وتزينوا للعرض الأكبر، يوم لا تخفى عليكم خافية.

‘তোমাদের নিকট হিসাব চাওয়ার পূর্বে নিজেরাই নিজেদের হিসাব করে নাও, তোমাদের আমল ওজন করার পূর্বে নিজেরাই নিজেদের আমলসমূহ ওজন করে নাও, কিয়ামত দিবসে পেশ হওয়ার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত কর, সুসজ্জিত হও, যেদিন তোমাদের নিকট কোনো কিছু অস্পষ্ট থাকবে না।

সারা বিশ্বে নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে অপচয় করা হয়েছে কোটি কোটি ডলার। আতশবাজি, পটকা ফুটানো, উদ্যাম নৃত্য, গান পরিবেশন, যুবক-যুবতীদের প্রেম নিবেদন, আলিঙ্গন, চুম্বন, মদের নেশা ও নারী নিয়ে ফূর্তি করাসহ রকমারি আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিদায় দেয়া হয়েছে ২০০৮ সালকে। বরণ করা হয়েছে ২০০৯ সাল। বাংলাদেশের ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতে আয়োজন করা হয়েছে নানা অনুষ্ঠানের। টিএসসিসহ উল্লেখযোগ্য স্পটগুলোতে তথাকথিত থার্টি ফার্র্স্ট নাইটে নববর্ষ উদযাপন করার নামে যেভাবে বেহায়া ও বেলেল্লাপনা, অবাধ যৌনাচার ও অপ্রীতিকর ঘটনার অবতারণা হয়, বাধ্য হয়ে এ দেশের সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হয় কড়া নিরাপত্তার। ২০০০ সালে থার্টি ফার্স্ট নাইটে বাঁধন নামের মেয়েটি যেভাবে লাঞ্চিত ও অপমানিত হয়েছে, তা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জন্য অপমান। অবশ্য যে মেয়েটি রাত ১২ টার পর ছেলে বন্ধুদের সাথে ফূর্তি করার জন্য রাস্তায় বের হতে পারে তার জন্য এর চেয়ে ভাল কিছু আশা করা যায় না।

ব্যাংককের একটি নাইটক্লাবে এ বছরের থার্টি ফার্র্স্ট নাইটে প্রাণ দিতে হয়েছে কমপক্ষে ৬০ জনকে। আহত হয়েছে আরো অনেকে। থাইল্যান্ডের ওই ক্লাবে তারা যখন আনন্দে আত্মহারা ঠিক তখনই বৈদ্যুতিক সর্টসার্কিটের মাধ্যমে আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে বেষ্টন করে নেয়। নিমিষেই সমাপ্তি ঘটে সকল আনন্দ উল্লাসের। এরপরও কি কেউ শিক্ষা গ্রহণ করেছে ? তওবা করে ফিরে এসেছে চির শান্তির পথে ? অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন-

ولنذيقنهم من العذاب الأدنى دون العذاب الأكبر لعلهم يرجعون.
‘আর অবশ্যই আমি তাদেরকে গুরুতর আজাবের পূর্বে লঘু আজাব আস্বাদন করাব, যাতে তারা ফিরে আসে। (আলিফ-লাম-মিম আস্সাজদাহ : ২১)

প্রিয় ভাই, আমি তোমাকে গত বছরের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য ভর্ৎসনা করার লক্ষ্যে সম্বোধন করছি না। বিগত দিনগুলো তোমার বেফায়েদা অতিবাহিত হয়েছে একথাও আমি বলছি না। কারণ অতীতে কী হয়েছে তা তো তুমিই ভাল জান আমার চেয়ে।

বরং আমি চাচ্ছি, তুমি জীবনকে অন্যভাবে দেখ, যেখানে থাকবে সুউচ্চ আশা, নিরলস আমল, নিয়মিত প্রচেষ্টা। তাই বলে আমি আবার ব্যর্থতাকে অস্বীকার করছি না। ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করা ব্যতীত সফলতা অর্জন প্রায় অসম্ভব। তাই তুমি সংকল্পকে সুদৃঢ় করে সকল ক্লান্তি দূর কর। এবং সকল চ্যালেঞ্জের মুখে বীরের মত এগিয়ে চল।

হয়ত তুমি গত বছর অনেক পরিকল্পনা করেছিলে। কিন্তু তুমি তার কোনো একটিও বাস্তবায়ন করতে পারনি। ফলে তোমার অন্তর তোমাকে তিরস্কার করছে। জীবন ব্যবস্থা কেমন যেন সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছে, নিরাশার মেঘমালা তোমার উপর ভর করে বসেছে। এ কারণে নিজেকে তুমি নিস্ফল তিরস্কার করছ। ফলে তোমার জীবনে নেমে এসেছে নিরাশা ও দুর্ভাগ্য। এবং উন্নতি-অগ্রগতির পথে দ্বিতীয় বার চলতে তুমি কুণ্ঠাবোধ করছ। ভাই আমার, সত্যি কথা বলতে গেলে আত্ম সমালোচনার ক্ষেত্রে নেতিবাচক দিকগুলো বড় করে দেখিয়ে শয়তান যাতে তোমার উপর কোনো প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, এ ব্যাপারে কঠিনভাবে সতর্ক থাকতে হবে। তকদিরের উপর বিশ্বাস করে কাজে-কর্মে সর্বদা ইতিবাচক থাকবে, যদিও তুমি ব্যর্থ হও। কখনও তুমি একথা বলবে না যে, আমি কোনো কাজে নিয়মিত থাকতে পারব না, অথবা কোনো কাজ পূর্ণ সম্পাদন করতে পারব না, আমি আমার নিজের সম্পর্কে ভাল জানি, আমি ছোট বেলা থেকে এ কাজের অভ্যাস করে এসেছি, অতএব, এটি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

বরং তমি বল, গেল বছরের ব্যর্থতা আমার প্রতিভা বিকাশের মাধ্যম হবে। সমস্যা সমাধানে কাজ দেবে। আমি অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করব। যাই হোক আমি তো চেষ্টা করে দেখেছি। আর এবারও চেষ্টা করে দেখব।

প্রিয় ভাই, তুমি যে কোনো কাজ সফলতার সাথে সমাধান করতে পারবে বলে নিজেকে মানিয়ে নাও।
জেনে রাখ, উন্নতির প্রথম পদক্ষেপ হলো সত্যিকার আগ্রহ ও সুদৃঢ় প্রত্যয়। আর এসব কিছুই হবে আল্লাহ তাআলার নিকট সাহায্য প্রার্থনার পর।
মনে রাখবে, সর্বপ্রথম তুমি নিজ থেকে নিজেকে পরিবর্তন করতে শুরু করবে। ইরশাদ হচ্ছে-

إن الله لا يغير بقوم حتى يغيروا ما بأنفسهم.

‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা কোনো জাতির অবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। (সূরা রা’দ : ১১)
কোন এক মহা মনীষীর বাণী –

عندما تكون لديك الرغبة المشتعلة للنجاح فلن يستطيع أحد إيقافك.

যখন তোমার কাছে সফলতা অর্জনের আলোকময় আগ্রহ থাকবে তখন কেউ তোমাকে থামাতে পারবে না। কি ঘটেছে এটা তোমার দেখার বিষয় নয়, বরং ঘটার পর তুমি কী করেছ, সেটাই দেখার বিষয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন

استعن بالله ولا تعجز، ولا تقل لو أني فعلت كذا وكذا لكنت كذا وكذا، ولكن قل قدرالله وما شاء فعل.

‘তুমি আল্লাহর নিকট সাহায্য চাও, অপারগতা প্রকাশ কর না, একথা বলো না যে, যদি আমি এমন এমন করতাম তাহলে এমন এমন হত। বরং বল, আল্লাহ যা ইচ্ছা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা ইচ্ছা তা-ই করেন।’

তোমার মজবুত আগ্রহ থাকলে অচিরেই তা নিজের পরিবর্তনের জন্য দৃঢ় সংকল্পে পরিণত হবে। শুধুমাত্র সঠিক পথ সম্পর্কে জানা থাকলেই যথেষ্ট নয়, বরং তা কাজে পরিণত করা অতীব জরুরি। জনৈক কবি বলেন –

إذا كنت ذا رأي فكن ذا عزيمة     *فإن فساد الرأي أن تتردد

যদি তুমি সুন্দর অভিমত প্রকাশ করতে পার, তাহলে তুমি দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী হও, কেননা অভিমত নষ্ট হয়ে যায় সংশয়ের কারণে।

নিজেকে পূর্ণ সামর্থবান সবল পুরুষ মনে কর। নিশ্চয় তুমি নিজেই উন্নতির বীজ বপন করতে পারবে। আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য তৈরী করেছেন কর্ণ, চক্ষু ও অন্তর। এবং তোমাকে বিবেক দিয়ে সম্মানিত করেছেন। অতএব, তোমার আশা-আকাক্ষার প্রতিফল ঘটাতে কখনও তুমি অপারগতা প্রকাশ কর না।
কবির ভাষায়,

ولم أر في عيوب الناس عيباً * كعجز القادرين على التمام.

মানুষের দোষ-ত্রুটির মাঝে সামর্থবান ব্যক্তির অপারগতা প্রকাশ হলো সবচেয়ে বড় দোষ। বাঁচার জন্য উৎফুল্ল হও, বিরক্তি প্রকাশের বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত কর, সংকল্পকে মজবুত কর এবং নিজেকে নিয়ে উপরে উঠতে থাক।

ভালো কিছু অর্জনের জন্য আজ বেঁচে থাক, অতীতের ব্যাপারে কোনো চিন্তা কর না, তবে ভাল কাজ অধিক পরিমাণে করার আগ্রহ প্রবল করতে অতীত নিয়ে ভাবতে পার। মনে রাখ, তওবা মানুষের পূর্বের গুনাহ মিটিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা তওবাকারী মুমিন সংশোধনে বিশ্বাসী বান্দাদের পাপরাশি নেক আমলে রূপান্তরিত করেন। বুক ভরা নতুন আশা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে চলতে থাক।

জেনে রাখ, প্রতিটি বিষয়ের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহভীতি। সফলতা ও তাওফিক একমাত্র আল্লাহর হাতে। অতএব, আল্লাহকে এই মর্মে ডাক যে, তিনি যেন তোমাকে তাওফিক দেন, এবং তোমার তাকওয়া, হেদায়েত, সফলতা ও কামিয়াবি বাড়িয়ে দেন। পরিশেষে ভ্রষ্ট ইবলিস থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাও। আর তুমি তওবাকারী একনিষ্ঠ বান্দাদের মত আকাশের তারকা হয়ে বেঁচে থাক। হে আল্লাহ তুমি কবুল কর। আমিন।

PDF আকারে ডাউনলোড করুন

আরো পোস্ট পেতে এখানে ক্লিক করুন।
____________________________
নববর্ষ  দ্যূতিময় আগামীর নতুন প্রেরণা
লেখক : চৌধুরী আবুল কালাম আজাদ
সম্পাদনা : আলী হাসান তাইয়েব
ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়া, রিয়াদ
কৃতজ্ঞতায় : ইসলাম হাউস

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s