বছর শেষ, কিন্তু কি পেলাম - www.islamerpath.wordpress.com

বছর শেষ, কিন্তু কি পেলাম?

বছর শেষ, কিন্তু কি পেলাম?

শারীরিক সুস্থতা, বাসস্থানের নিরাপত্তা ও পর্যাপ্ত উপাদেয় খাদ্যসামগ্রী জীবন চলার পথে শক্তি যোগায়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

من أصبح منكم آمناً في سربه، معافىً في بدنه، عنده قوت يومه، فكأنما حيزت له الدنيا بحذافيرها. (أخرجه الترمذي وابن ماجة وهو حديث حسن)

যে ব্যক্তি বাসস্থানে নিরাপত্তা ও শারীরিক সুস্থতার সাথে সকালে উপনিত হল এবং তার নিকট এক দিনের খাবার রয়েছে, কেমন যেন গোটা দুনিয়া তার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে।

উল্লেখিত তিনটির কোন একটি হারিয়ে ফেললে মানুষের জীবন হয়ে যায় দুর্বিষহ, এমনকি কখনও কখনও এর ফলে মানুষ মৃত্যুও কামনা করে থাকে। আর কোন ব্যক্তি সেগুলো পুরোপুরি পেয়ে গেলে- তার দিন,মাস ও বছর পার হওয়ার অনুভূতিটুকুও জাগেনা।

বিগত বছরটি কেমন যেন গতকাল শুরু হয়েছিল, আর বলতে না বলতেই তা শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছে দিন ও মাসগুলো

আমরা অতিক্রম করিনি। কিন্তু! … অসুস্থ, বন্দি, ক্ষুদার্ত, ভীত ও জেলখানায় আবদ্ধ ব্যক্তিদের কথা কি কখনও ভেবে দেখেছেন? দুরাবস্থার কারণে তাদের নিকট একটি দিন যেন বছরতুল্য।

আত্ম সমালোচনার প্রয়োজনীয়তা

এ বছরের শেষ দিনে মুহাসাবা তথা হিসাব কষতে হবে। মুমিন ব্যক্তি ভাল করেই জানে তার জীবন অনর্থক নয়, আর তাকে অহেতুক সৃষ্টি করা হয়নি। তার এ বিশ্বাসও আছে যে, তাকে এমনিই ছেড়ে দেয়া হবেনা। মানুষ জীবনে অনেক আমল করে আবার ভুলে যায়। কিন্তু কিয়ামত দিবসে তাদের সবকিছুর প্রতিদান দেয়া হবে। ইরশাদ হচ্ছে –

يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوا أَحْصَاهُ اللَّهُ وَنَسُوهُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ ﴿6﴾ سورة المجادلة

সেদিন স্মরণীয়; যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন, অতঃপর তাদেরকে জানিয়ে দিবেন যা তারা করত। আল্লাহ্‌ তার হিসাব রেখেছেন, আর তারা তা ভুলে গেছে। আল্লাহর সামনে উপস্থিত আছে সব বস্তুই।

মানুষ প্রতিনিয়ত হাজারো নিয়ামতে ডুবে আছে। তাদের সামনে এমন অনেক বিষয় উপস্থিত হয় যা তাদেরকে হিসাব-নিকাশ ও আখেরাতের কথা ভুলিয়ে দেয়।

মুহাসাবা কিভাবে করতে হয় :                      

প্রত্যেকে নিজ আমলের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিৎ। সকলেই চিন্তা করবে কিভাবে সে বিগত বছর কাটিয়েছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে তার মহা মূল্যবান সময়টুকু।  বিগত বছেরে তার রবের সাথে তার কতটুকু সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল?

সে কি ফরজ আমলগুলো ঠিকমত পালন করেছে এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থেকেছে?

ঘরে থাকা অবস্থায় কি আল্লাহকে ভয় করেছে?

কাজে কর্মে সর্বদা সে কি আল্লাহর কথা স্মরণ করেছে?

যদি সে এমনটি করে থাকে তাহলে সে এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করেছে, কেমন যেন সে আল্লাহকে দেখছে। আর যদি সে তাঁকে দেখতে না পায়, তাহলে একথা মনে করবে যে, আল্লাহ্‌ তো তাকে দেখছে।

যে ব্যক্তি ইহকালে নিজের হিসাব গ্রহন করে সে আখেরাতে নিরাপদ থাকবে। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে বেশি বেশি হেসে অল্প অল্প কাঁদবে তার ব্যাপারে আখেরাতে বেশি কাঁদার ভয় আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন :

فليضحكوا قليلا وليبكوا كثيراً (سورة التوبة : 82)                                                                  

অতএব তারা অল্প হাসুক এবং বেশি করে কাদুক। (সূরা তাওবা : ৮২)

সাহাবী ইবনে আব্বাস রা. বলেন :

الدنيا قليل فليضحكوا فيها ما شاؤا فإذا انقطعت وصاروا إلى الله تعالى استأنفوا في بكاء لا ينقطع عنهم أبداً. (أخرجه ابن جرير وابن أبي شيبة بإسناد صحيح)

দুনিয়া অল্প সময়ের, এখানে যতটুকু ইচ্ছা হেসে  নিক। যখন দুনিয়া ত্যাগ করে আল্লাহর নিকট যাবে , তখন নতুন করে কাঁদতে শুরু করবে, যে কাঁদা আর কখনও শেষ হবেনা।

সাহাবী আবু হুরাইরা ও আবু সায়ীদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

يؤتى بالعبد يوم القيامة فيقال : ألم أجعل لك سمعاً وبصراً ومالاً وولداً، وسخرت لك الأنعام والحرث، وتركتك ترأس وترتع فكنت تظن أنك ملاقي يومك هذا؟ فيقول : لا، فيقول له : اليوم أنساك كما نسيتني. (أخرجه الترمذي بسند صحيح)

কিয়ামত দিবসে এক ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে, অতঃপর তাকে বলা হবে আমি কি তোমাকে চক্ষু, কর্ণ, সম্পদ ও সন্তান দান করিনি? এবং ক্ষেত-খামার ও চতুস্পদ জানোয়ার বশিভুত করে দেইনি? শুধু তা-ই নয়, আমি তোমাকে নেতৃত্ব দিয়েছি। আচ্ছা তুমি কি আজকের দিনের সাক্ষাতের কথা ভেবে দেখেছ? সে তখন বলবে : না। তখন তাকে বলা হবে : আজকের দিন তোমাকে আমি ভুলে যাচ্ছি, যেমনিভাবে তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছ।

(তিরমিযী রহ. বলেন: اليوم أنساك  এর অর্থ اليوم أتركك في العذاب অর্থাৎ আজকে তোমাকে আমি আযাবে গ্রেফতার করব।)

দেহের চিকিৎসার চেয়ে অন্তরের চিকিৎসার গুরুত্ব অধিক :

যখন শারীরিক অসুস্থ ব্যক্তি নিজের রোগ নির্ণয় করে তার চিকিৎসার জন্যে ব্যস্ত হয়ে যায়, তখন গুনাহের কারণে অন্তরের অসুস্থ ব্যক্তি আরো অধিক পরিমাণে চিকিৎসার জন্যে ব্যস্ত হওয়া উচিৎ।

দৈহিক চিকিৎসার তুলনায় আত্মিক চিকিৎসার গুরুত্ব অপরিসীম। দৈহিকভাবে মারাত্মক রোগাগ্রস্থ ব্যক্তির জীবন যদি আযাবে পরিণত হয়, তাহলে আখেরাতের আযাব তো আরো অধিক কঠিন ও যন্ত্রনাদায়ক।

বর্তমান যুগে গুনাহ ও অপরাধের ময়দান বড় প্রশস্ত এবং এর দিকে আহ্বানকারী অনেক। আর আনুগত্যের রাস্তাগুলো সংকীর্ণ এবং তার দিকে আহ্বানকারীও অতি সামান্য। ফিৎনা জোয়ারের মত ধেয়ে এসে ঘরে-বাইরে ও বাজারে মানুষকে পাকড়াও করে, সন্তান-সন্ততি ও নারীদের ধ্বংস করছে।

বাতিলপন্থীরা সদা-সর্বদা আল্লাহর বান্দাদের ভ্রান্ত পথের দিকে আহ্বান করে। অতএব, আমরা আমাদের নিজেদের ঘর থেকে কিভাবে তা প্রতিরোধ করব?

বছর অতিবাহিত হচ্ছে এবং গুনাহ বেড়েই চলছে, পরকাল নিকটবর্তী হচ্ছে, আর আমরা তা থেকে সম্পূর্ণ গাফেল, আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত কতেক লোকের কথা ভিন্ন। তাদের সংখ্যা খুবই কম। আমরা অল্প নেক আমল করেই আল্লাহর সামনে বড়াই করি এবং কবীরা গুনাহ ও ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হই। আমরা যে গাফেল তা কি আমরা উপলব্ধি করতে পারছি?

একদল লোক ইব্রাহীম ইবনে আদহাম রহ. এর নিকট এসে অনাবৃষ্টির অভিযোগ করে আল্লাহর নিকট দু‘আ চাইতে বললেন। তিনি বললেন : তোমরা অনাবৃষ্টির অভিযোগ করছ, আর আমি তো আকাশ থেকে পাথর নিক্ষেপের অপেক্ষা করছি।

উম্মতের উপর গুনাহের কুপ্রভাব:

অধিকাংশ মানুষ অধিক পরিমাণে গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণে মুসলিম উম্মাহ খাবারের সাধারণ দস্তরখান ও খোলা সিন্দুকে পরিণত হয়েছে, তারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে, ফলে আল্লাহও তাদেরকে ভুলে গিয়েছে। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার কারণে তাদের শত্রুদের তাদের উপর লেলিয়ে দিয়েছেন।

গুনাহ ও অপরাধ তাদেরকে অপদস্ততা উপহার দিয়েছে। গুনাহের সাথে অন্তর নিস্তব্ধ হয়ে মরে গিয়েছে। এতিমদের অশ্রু দেখে চক্ষু এবং  বিধবাদের কান্নার আওয়াজ শুনে কর্ণসমূহ কেমনযেন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। অনেক জায়গায় অবিবাহিত মুসলিমের চরিত্র ধ্বংস করা খুব সহজ কাজে পরিণত হয়েছে, বরং কাফেরদের পক্ষ থেকেও তাদেরকে আনন্দ উল্লাসের জন্যে আহ্বান করা হয়। (লা হাওলা ওয়া লা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল ‘আলিয়্যিল আযীম।)

সবচেয়ে বড় মুসীবত হলো, এসব সত্ত্বেও আজও মুসলমানগণ পারস্পরিক দন্দে দ্বিধা বিভক্ত। তারা একে অপরকে অপছন্দ করে, বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের পারস্পরিক বিদ্বেষ কাফেরদের প্রতি বিদ্বেষকেও হার মানায়। এসব কেন?

PDF আকারে ডাউনলোড করুন

আরো পোস্ট পেতে এখানে ক্লিক করুন
______________________________________
বছর শেষ, কিন্তু কি পেলাম?
লেখক : ইব্রাহীম ইবনে আব্দুল্লাহ আল-হুকাইল
অনুবাদ : আবুল কালাম আজাদ
সম্পাদনা : মুহাম্মদ শামসুল হক সিদ্দিক
ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়া, রিয়াদ
কৃতজ্ঞতায় : ইসলাম হাউস

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s