পুণ্যের দূত

Punner_Dut_www.islamerpath.wordpress.com

যখন আমার প্রথম ছেলে জন্মগ্রহণ করে, তখন আমার বয়স ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। সেই রাতের কথা কখনও ভুলতে পানি না। দীর্ঘ রাত পর্যন্ত বন্ধুদের এক আড্ডায় গল্পে মত্ত ছিলাম। গল্প মানে অনর্থক যত বিষয়-গীবত, শেকায়েত, পরনিন্দা, হাসি-ঠাট্টা ইত্যাদি। হাসি ছিল মাত্রা ছাড়ানো। আর আমার দুষ্টুমি ছিল সবার উপরে। কারও আচরণ নকল করার বিদ্যা যেকেউ আমার কাছ থেকে শিখতে পারে। কারও আচরণ বা কথাবার্তা অবিকল নকল করতে আমার সময় লাগে কয়েক মুহূর্ত। এতে আমার বন্ধুরা খুব মজা পায়। আমি যেকারও কণ্ঠ নকল করতে পারতান। আর আমার এই অপকর্ম থেকে রক্ষা পেয়েছে, এমন কোন বন্ধু হয়তো নেই।

সেই রাতে নতুন দুষ্টুমি আমার মাথায় চেপেছিল। সন্ধায় বাজার হয়ে কোথাও যাচ্ছিলাম। ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করছিল এক অন্ধ লোক। আমি তার সামনে পা বাড়িয়ে দিলাম। ডিগবাজি খেয়ে পড়ে গেল সে। আমার দিকে ফিরে বেচারা অনেক বকাবকি করল। অনেক কিছু বলতে বলতে সামনে এগিয়ে গেল। এদিকে আমি এই আচরণের জন্য লজ্জিত হওয়ার বদলে খিলখিলিয়ে হাসছিলাম।

শেষ রাতের দিকে আমি বাসায় ফিরলাম। স্ত্রী আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তখন আমকে তার প্রয়োজন ছিল সীমাহীন। জরুরীভিত্তিতে হাসপাতালে যাওয়ার দরকার ছিল। আমাকে দেখে তিনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, রাশেদ! কোথায় ছিলে?

আমি অবজ্ঞার সুরে জওয়াবে বললাম, একটু মঙ্গলগ্রহে গিয়েছিলাম; আর কোথায় যাব? সেখানে গিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম।

খুব কষ্টে আমার স্ত্রী বললেন, ‘আমার স্বাস্থ্য খুব খারাপ। মনে হচ্ছে প্রসবের সময় খুব ঘনিয়ে এসেছে।’ তার চোখের পানি দেখে নিজের ভুল অনুভূত হল। কেননা, স্ত্রীর সাথে আমি ভালো ব্যবহার করিনি। সেই দিনগুলোতে তাকে দেখাশোনা করা এবং তার প্রতি খেয়াল রাখা আমার জন্য ফরয ছিল। ইশ, যদি আমি বন্ধুদের সাথে অত সময় না থাকতান! যাক, সব ভাবনা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে স্ত্রীকে সঙ্গে নিলাম। বিলম্ব না করে রওয়ানা হলাম হাসপাতালের দিকে। রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। ভোর হতে দেরি ছিল খুব সামান্য। নার্সরা আমার স্ত্রীকে ওয়ার্ডে নিয়ে গেলেন। আমি বাইরে বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার ঝিমুনি পেল। কষ্টও হতে লাগল। বাসায় যেতে মনস্থ করলাম। এক নার্সকে আমার ফোন নাম্বার দিয়ে বললাম, প্রসব হয়ে গেলে আমাকে খবর দিবেন।

বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরেই হাসপাতাল থেকে ফোন এল। ছেলে হওয়ার সুসংবাদ জানানো হল। বিলম্ব না করে হাসপাতালে উপস্থিত হলাম। প্রসূতি ও শিশুর ব্যাপারে জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষ বললেন, এই কেইসে কর্তব্যরত মহিলা ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

আমার আবেগ ছিল সীমাহীন। ছেলেকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। আমি বললাম, ডাক্তারের সাথে পরে যোগাযোগ করব। আগে বলুন, আমার ছেলে কোথায় আছে? আমি তাকে দেখতে চাই। জওয়াবে বলা হল, আগে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। আমি ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করলাম। তিনি আমাকে ইঙ্গিতে বসতে বললেন। এরপর দীর্ঘ ভূমিকা পেশ করলেন। বালা-মসিবত ও পেরেশানীর উল্লেখ করে তাকদীরের উপর সন্তুষ্ট থাকার ফযীলত তুলে ধরলেন। তারপর আচানক তিনি ভয়ঙ্কর একটি সংবাদ দিলেন। বললেন, বাচ্চার চোখে সমস্যা আছে। মনে হচ্ছে যে কখনও দেখতে পারবে না; অন্ধ হবে।

ডাক্তারের কথা শুনে আমার মাথা নত হয়ে এল। চোখের সামনে ভেসে উঠল গত সন্ধার সেই অন্ধ লোকটির ছবি, যার সাথে আমি ঠাট্টা করেছিলাম। আমার কিছু বলার ছিল না। ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে সেই কক্ষ ত্যাগ করলাম। এগিয়ে গেলাম প্রসূতিকক্ষের দিকে। আমার স্ত্রী হলেন সবর ও শুকরের জীবন্ত প্রতীক। তিনি আমাকে শতসহস্র বার উপদেশ দিতে, কারও সাথে ঠাট্টা কোরো না; গীবত থেকে বিরত থাকো। পরের নিন্দা করো না। কিন্তু আমি তার উপদেশ এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিতাম।

পরের দিন আমরা হাসপাতাল থেকে বাসায় এলাম। ছেলের নাম রাখলাম সালেম। আমার কল্পনার আরশিতে স্ত্রীর উপদেশগুলো কিছুক্ষণ ঝলমল করে আবার নিভে গেল। সত্য বলতে কি, সালেমের প্রতি আমার কোন ভালোবাসা ছিল না। আমি তার দিকে কখনো মনোযোগ দিতাম না। মনে করতাম, বাসায় সালেম নামে কেউ নেই। যখন সে কাঁদত, তখন আমি উঠে অন্য কামরায় চলে যেতাম। কিন্তু আমার স্ত্রী ওকে ভীষণ ভালোবাসতেন। খুব যত্ন করতেন। সালেমের প্রতি আমার কোন ঘৃণাবোধ ছিল না বটে; তবে ওর প্রতি আমার কোন ভালোবাসা ছিল না।

সময়ের সাথে সাথে সালেম বড় হতে থাকল। হামাগুড়ি দেওয়া শিখল। ওর হামাগুড়ি অন্য শিশুদের থেকে ভিন্ন ছিল। যখন ওর বয়স একবছর হয়ে গেল, তখন আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল ও। ওর হাঁটা তেকে পরিষ্কার হতে লাগল যে, পায়ে খানিকটা ল্যাংড়ামিও আছে। সালেমের বিভিন্ন প্রতিবন্ধিতা আমার মস্তিষ্কের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিল। সালেমের পর আমার ঔরসে আরও দুটি সন্তান হল- ওমর ও খালেদ। সময়ের গতি কত দ্রুত, সেটা অনুমানই করা যায় না। চলে গেল কয়েক বছর। আমার ছেলেরা সব বড় হয়ে গেল; কিন্তু আমার দিবানিশিতে কোন পরিবর্তন এল না। আমি ঘরে বসিই না; সবসময় বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মত্ত থাকি। আড্ডার মূল আকর্ষণ আমি। একজন জোকার, যে বন্ধুদেরকে সবসময় হাসি-আনন্দে মাতিয়ে রাখে।

আমার শতসহস্র অন্যায় সত্ত্বেও একটি সত্তা ছিল, যে আমার ব্যাপারেও নিরাশ ছিল না। আমার কল্যাণ কামনা করে তার দোআ ছিল অব্যাহত। আপনাকে বলব, সেই সত্তা কে? আমার বাচ্চাদের মা। আমার স্ত্রী সারা রাত আমার জন্য অপেক্ষা করতেন। আমি সালেম বাদে অন্য বাচ্চাদের অনেক ভালোবাসতাম। সালেমের সাথে সম্পর্ক ছিল দায়ঠেকা গোছের। সত্য বললে সেই সম্পর্ক না থাকার মতই। এই একটি বিষয়েউ আমার স্ত্রী অনেক কষ্ট পেত। সালেম ও তার এক ভাই স্কুলে যাওয়ার উপযুক্ত হল। তবুও সময় সম্পর্কে আমার অনুভূতি জাগল না। আমার কাজ অফিসে যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া করা, আর রাতভর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া।

এক জুমাবারের কথা। নিয়মের খেলাফ, সে দিন এগারোটা বাজে ঘুম থেকে উঠেছিলাম। ওলীমার অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল। এজন্য নতুন কাপড় পরিধান করে আতর লাগালাম। এরপর বাসা থেকে বের হতে লাগলাম। কামরা থেকে বের হয়ে দেখি সালেম যারযার হয়ে কাঁদছে। আমার পা থেমে গেল। জীবনে এই প্রথম সালেমের কান্না দেখে আমি থেমে গেলাম। দশ বছর গত হয়ে গেছে, কখনও আমি তার দিকে ভালো করে তাকাইনি। একটু আদরও করিনি। আজও ইচ্ছা ছিল যে, ওকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত চলে যাব। ও ওর মাকে ডাকছিল। জানি না, কী জযবা আর আবেগের কারণে তার দিকে ফিরলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, সালেম! কাঁদছ কেন?

আমার কথা শুনে ও কান্না বন্ধ করল। যখন ও বুঝতে পারল যে, আমি আশপাশে কোথাও আছি, তখন খুব কাছে রয়েছি কি না, তা উপলব্ধি করার জন্য ডানে বামে হাত নাড়তে লাগল।

যখন ও বুঝতে পারল যে, আমি খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছি, তখন ও একদিকে সরে যেতে লাগল। আমি আরও নিকটবর্তী হতে চাইলাম ওর। কিন্তু ও দূরে চলে গেল। কেমন যেন ও আমাকে আগের সমস্ত আচার-ব্যবহারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছিল, আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন? দশ বছর পর আমার কথা মনে পড়ল?

আমি ওর পিছু নিলাম। ও নিজের কামরায় চলে গেল। আমিও ওর পিছনে গেলাম। এরপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, সালেম! বাবা, কাঁদছিলে কেন? কিন্তু ও আমাকে কান্নার কারণ জানাতে অস্বীকার করল। আমি আরও কাছাকাছি হলাম ওর। তারপর ওর কোমল হাত ধরে আদর করে জিজ্ঞেস করলাম, বেটা! কাঁদছিলে কেন?

আমার পীড়াপীড়িতে কান্নার কারণ বলতে লাগল সালেম। আমি যতেই ওর কথা শুনছিলাম, ততই আমার দিলের অবস্থা পরিবর্তন হচ্ছিল। আমার কণ্ঠ বন্ধ হয়ে গেল। শ্বাস দ্রুত পড়তে লাগল। সালেমের কান্নার কারণ কী ছিল, বলব আপনাকে? আজ ওর ভাই ওমর ঘুমিয়ে পড়েছিল। সে ওকে সময়ের আগেই মসজিদে নিয়ে যেত। সেদিন ছিল জুমাবার। এজন্য তার আশঙ্কা ছিল যে, বিলম্বের কাররণে হয়তো প্রথম কাতারে জায়গা পাওয়া যাবে না। এরপর সালেম ওমরকে ডাকল; ওর মাকে ডাকল। কিন্তু কেউ এগিয়ে এল না। তখন ও আবার কান্না শুরু করল। আমি ওর অশ্রু দেখতে পেলাম, যা ওর দৃষ্টিহীন চোখদুটি থেকে গড়িয়ে পড়ছিল। ওর বাকি কথাগুলো আর শুনতে পারলাম না। আগে বেড়ে ওর আলোহীন চোখের উপর হাত রেখে জিজ্ঞেস করলাম, সালেম! শুধু মসজিদের যেতে দেরি হওয়ার কারণেই কি কাঁদছিলে?

ও জওয়াব দিল, জি; হাঁ।

মানুষ অত্যন্ত গাফেল ও কমজোর প্রাণী। সে কি জানে সামনের মুহূর্তে তার ভাগ্যে কী আছে? নিজের অন্ধ ছেলের সাথে কথা বলার এই সময়টুকু ছিল এমন বৈপ্লবিক যে, মুহূর্তের ব্যবধানে আমার জীবনের ধারা বদলে দিল। আমার জীবনে পরিবর্তন এল। বন্ধুদেরকে ভুলে গেলাম। ভুলে গেলাম যে ওলীমার অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল, তা-ও।

আমি সালেমকে সম্বোধন করে বললাম, সালেম! পেরেশান হয়ো না। তুমি কি জান আজ তোমার সঙ্গে কে মসজিদে যাবে?

ও বলল, নিশ্চয়ই ওমর যাবে; কিন্তু সে তো সবসময় দেরি করে! আমি বললাম, চিন্তা করো না; আজ তোমার বাপ তোমাকে মসজিদে নিয়ে যাবে। আজ তোমার আঙুল ধরে আমিই যাব।

সালেম বিস্মিত হয়ে গেল। বিশ্বাস হল না ওর। ওর ধারণা হল আমি ওর সাথে মজাক করছি। কি যেন ভেবে কান্না বন্ধ করল ও।

আমি ওর চোখের পানি মুছে দিলাম। তারপর বাযু ধরে গাড়ির দিকে নিয়ে গেলাম। কিন্তু গাড়িতে চড়তে অস্বীকার করল ও । বলল, আব্বু! মসজিদ খুব কাছে। আমি পায়ে হেঁটে যেতে চাই, যাতে প্রতি কদমে কদমে সওয়াব পাওয়া যায়।

সর্বশেষ কবে মসজিদে গিয়ে ছিলাম, তা আমার মনেই পড়ে না। কিন্তু এই জীবনের প্রথম লজ্জিত হয়ে জমীনে পতিত হলাম এবং এতদিন পর্যন্ত মহান প্রভু থেকে সম্পর্কহীন থাকার কারণে অনুশোচনা অনুভূত হল। মসজিদ মুসল্লী দিয়ে ভরে গিয়েছিল। একটু চেষ্টা করে সালেমের জন্য প্রথম কাতারে জায়গা নিতে হল। আমরা জুমার খুতবা শুনলাম। তারপর দাঁড়ালাম নামাযের জন্য। সালেম আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল; বরং সত্য বললে বলতে হয়, আমিই ওর পাশ দাঁড়িয়ে নামায আদায় করলাম।

নামায শেষ হলে সালেম বলল, আমাকে একটি কুরআন শরীফ এনে দিন। আমি অবাক হয়ে গেলাম। এই ছেলে কুরআন পড়বে কীভাবে? এ তো অন্ধ। একবার ভাবছিলাম, ওর এই কথা শুনবার প্রয়োজন নেই; কিন্তু পরে চিন্তা-ভাবনা ফেলে দিয়ে কুরআনের একটি কপি নিয়ে ওর হাতে দিলাম। এবার ও বলল, সুরা কাহাফটা একটু বের করে দিন। আমি সূচিপত্র দেখে দেখে সুরা কাহাফ বের করলাম। সালেম কুরআন মাজীদ হাতে নিল। অত্যন্ত আদব ও এহতেরামের সাথে কুরআন মাজীদ সামনে রেখে সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করতে লাগল সালেম। ওর চোখ ছিল নিষ্প্রভ।

কিন্তু তা সত্ত্বেও পূর্ণ ধীরস্থিরতার সাথে তেলাওয়াত করতে থাকল। স্পষ্ট হয়ে গেল যে, যদিও ওর চোখ দীপ্তিহীন; কিন্তু পুরো সুরা ওর মুখস্ত। আমার বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে গেল।

আমার লজ্জা অনুভূত হতে থাকল। আমি কুরআনের একটি কপি হাতে নিলাম। বের করলাম সুরা কাহাফ। আমার শিরা-উপশিরায় এক প্রকার বিদ্যুৎ খেলে গেল। আমি কুরআন কারীম পড়া শুরু করলাম। পড়তে থাকলাম। অনেকক্ষণ পর্যন্ত পড়তে থাকলাম। যত পড়তে তাকলাম, ততই আমার চোখের উপর থেকে গাফলতের পর্দা সরে যেতে থাকল। তারপর ধরা গলায় আমার রবের কাছে হেদায়েতের দোআ করলাম। নিজেকে সামলাতে পারলাম না। অতীতের ধুলোর আবরণ দূর হয়ে গেল। স্মৃতির আয়নায় অতীতের বিভিন্ন ঘটনা ঝলমল করতে লাগল। নিজের গুনাহের কথা মনে পড়ে গেল এবং অনুতাপ এত তীব্র হল যে, আমি শিশুদের মত ফোঁপাতে লাগলাম।

কিছু কিছু মুসল্লী সুন্নত পড়ছিলেন। তাদের কারণে আমার লজ্জা অনুভূত হল। খুব চেষ্টা করলাম, যাতে আমার ফোঁপানো বন্ধ হয়। এতে আমার আওয়াজ বন্ধ হল। এখন দীর্ঘ শ্বাস পড়ছিল এবং কণ্ঠনালী থেকে হেচকি উঠছিল। আচানক একটি কোমল হাত আমার চেহারা মুছতে লাগল। আমার চোখের পানি মুছে দিল সে। এ ছিল আমার ছেলে সালেম। আমি বুকে জড়িয়ে ধরলাম তাকে। দরদভরা দৃষ্টিতে তার দিকে দেখলাম আর মনে মনে বললাম, অন্ধ তুমি নও; অন্ধ আমি।

এরপর আমরা বাসায় ফিরলাম। আমার স্ত্রী সালেমের কথা ভেবে চিন্তায় নিমজ্জিত ছিল। তার জানা ছিল না যে, আজ আমি তাকে জুমা পড়ানোর জন্য নিয়ে গেছি। যখন তিনি জানতে পারলেন, আমরা বাপ-বেটা একত্রে মসজিদে গিয়েছিলাম, তখন তাঁর অস্থিরতা আনন্দে বদলে গেল। এরপর আমার জীবনে এমন বিপ্লব এল যে, সেদিন থেকে আর কখনও নামায কাযা হয়নি। আমি খারাপ সোসাইটি ছেড়ে দিলাম। এখন আমি মসজিদে নামাযীদের মধ্য থেকে সবচেয়ে ভালো ও পরহেযগার লোকদের বন্ধু বানিয়ে নিয়েছি। আমি অনুভব করে ফেলেছি ঈমানের স্বাদ। নেককার বন্ধুবান্ধব থেকে দীনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখেছি।

এরপর আমার অবস্থা হয়েছে এই যে, তালীমের কোন হালকা এবং কোন দ্বীনী প্রোগ্রামে আমি কখনও অনুপস্থিত থাকি না। কুরআন কারীমের তেলাওয়াত আমার আদতে পরিণত হয়েছে। মাসে অন্তত একবার কুরআনুল কারীম খতম করি। আমার যবানে আল্লাহ তাআলার হাম্‌দ-সানা জারী থাকে। অতীতের কথা মনে পড়লে আরও বেশি করে যিকির-আযকার করি, যাতে আল্লাহ তাআলা আমার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেন। মানুষের সাথে কত কষ্টদায়তক আচার-ব্যবহার করেছি। তাদের আচরণ ও কথাবার্তা নকল করতাম। তাদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতাম। তাদের ব্যাপারে কটু মন্তব্য করতাম। তাদের মনের শীশা ভাঙতাম। আহ! কী ভয়ানক অন্ধকার অলি-গলিতে ঘুরে বেড়াতাম আমি!

এখন আমি পরিবারের লোকদের অনেক আপন হয়ে গেছি। আমার স্ত্রীর চেহারায় এখন রওনক এসেছে। কোথায় তার সেই উদাস চেহারা, যখন তিনি আমার ব্যাপারে চিন্তিত ও বিষণ্ন থাকতেন, আর কোথায় তার বর্তমান মুচকি হাসি, আর আনন্দসিক্ত অম্লান বদন!

এরপর আমার সালেমেরও আনন্দের সীমা রইল না। ঘরে বসন্ত এল। আমার বেশিরভাগ সময় সালেমের সাথে অতিবাহিত হয়। আল্লাহ তাআলার অজস্র নেয়ামতের উপর শুকর আদায় করি।

একদিন কয়েকজন সাথী বললেন, আমরা আল্লাহর দীনের দাওয়াত নিয়ে দূরের কোন দেশে যেতে চাই। আপনিও আমাদের সঙ্গে চলুন। আমি দাওয়াত ও তাবলীগের মহান ফরয সম্পর্কে একদম বে-খবর ছিলাম। জমীনের বোঝা হয়ে বসে ছিলাম। কখনও ভুলেও মনে হয়নি যে, দাওয়াত ও তাবলীগের জন্য পা বাড়ানো দরকার। একটু দ্বিধায় পড়ে গেলাম; কিন্তু তাদের পীড়াপীড়ি অব্যাহত। এস্তেখারা করলাম; স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করলাম। তিনি তো অনেক দিন থেকে আশা করছিলেন যেন সুদৃঢ় দীনের দাঈ হয়ে যাই। আমি ভাবছিলাম, তিনি আমাকে দেশের বাইরে যেতে দিতে চাইবেন না; কিন্তু ফল বের হল সম্পূর্ণ বিপরীত।

আমি তাঁর ঈমানদীপ্ত প্রতিক্রিয়ায় যারপরনাই খুশি হলাম। তিনি আমাকে সাহস দিলেন। তাঁকে না জানিয়ে পাপ আর অনাচারের উদ্দেশ্যে কত দেশে যেতাম; অথচ এখন যাচ্ছি ইসলামের পয়গাম প্রচারের জন্য। এখন তাঁর আপত্তির প্রশ্ন আসে কোত্থেকে?

আমি সালেমের সাথে কথা বললাম। সফরের উদ্দেশ্য খুলে বললাম ওকে। ও ওর ছোট দুটি হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরল। বলল, আব্বু! দাওয়াত ও তাবলীগ প্রত্যেক মুসলমানের যিম্মাদারী। আপনি দাওয়াতের কাজে বিলম্ব না করে চলে যান।

অবশেষে আমি তাবলীগী সফরে বের হয়ে পড়লাম।

ঘর থেকে বের হওয়ার পর তিন মাসের অধিক সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে বেশ কয়েক বার পরিবারের লোকজনের সাথে কথা বলছি। কিন্তু কেন যেন সালেমের সাথে কথা বলা সুযোগ হয়ে উঠল না। যখনই কথা বলতাম, তখনই সে হয়তো স্কুল অথবা মসজিদে গিয়ে থাকত, অথবা ঘুমিয়ে থাকত। তার কণ্ঠ শোনার তামান্না (আকাঙ্ক্ষা) ছিল অপরিসীম। অন্য বাচ্চাদের সাথে কথা হয়েছিল; কিন্তু সালেমের কথা শোনার সুযোগ হল না।

যখনই স্ত্রীকে ফোন করতাম তখনই তিনি আমাকে সালেমের কথাবার্তা শোনাতেন। তারপর একদিন আমরা দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। স্ত্রীকে ফোন করে বললাম, আমরা ফিরে আসছি। বাচ্চার কেমন আছে? সালেম কেমন আছে? আজ তাঁর কণ্ঠ অন্য রকম শোনাল। যে অদম্য আগ্রহ আর উদ্দীপনা নিয়ে তিনি কথা বলতেন, আজ কণ্ঠে সেটা পাওয়া গেল না। আমি তাঁকে বললাম, সালেমকে সালাম বলবে এবং ওকে জানাবে যে, আমি ফিরে আসছি। স্ত্রী ইনশা-আল্লাহ বলে নীরব হয়ে গেলেন এবং ফোন বন্ধ হয়ে গেল।

ঘরে ফিরে এলাম। দরজায় নক করলাম। কল্পনার জানালা দিয়ে দেখছিলাম যে, সবার আগে সালেম এগিয়ে আসছে এবং আমাকে সম্ভাষণ জানাচ্ছে। দরজাও সে-ই খুলছে। কিন্তু তাজ্জব হলাম, সালেমের বদলে আমার চার বছর বয়সী ছেলে খালেদ বাবা বাবা বলতে বলতে হাত ধরে ঝুলে পড়ল।

সেদিন কেন যেন বুকের ভিতরে ব্যথা অনুভূত হচ্ছিল। আমি ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ্‌ শাইত্বানির রজীম’ পড়ে ঘরে প্রবেশ করলাম। সম্ভাষণ জানানোর জন্য এগিয়ে এলেন আমার স্ত্রী। তাঁর চেহারা মলিন দেখাল। সবসময় যেই ঠোঁটে মুচকি হাসি লেগেই থাকে, তাতে আজ কৃত্রিমতার স্বচ্ছ আভাস। আমি বললাম, সবাই ভালো আছ? আচ্ছা, তোমার কী হয়েছে?

তিনি বললেন, না; কিছু তো হয়নি।

এরপর আচানক আমার সালেমের কথা মনে পড়ল। জিজ্ঞেস করলাম, সালেম কোথায়?

স্ত্রী মাথানত করলেন। কোন জওয়াব দিলেন না। তাঁর চোখ থেকে অশ্রুর বন্যা বয়ে যেতে লাগল। আমি চিৎকার দিলাম, সালেম…সালেম কোথায়? আমার ছেলে খালেদ এগিয়ে এসে তো তো করে বলল, বাব! ভাইয়া জান্নাতে চলে গেছে; আল্লাহ তাআলার কাছে।

আমার স্ত্রীর ধৈর্যের পাত্র উথলে উঠল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন তিনি। মনে হল জমীনে পড়ে যাবেন তিনি। সুতরাং আমি কামরা থেকে বের হয়ে এলাম। নিজকে সামলাতে পারলাম না। ডুকলে ডুকরে কাঁদতে লাগলাম।

পরে জানতে পারলাম, আমার ফিরে আসার তারিখ থেকে পনেরো দিন আগে সালেমের জ্বর হয়েছিল। আমার স্ত্রী ওকে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু যত চিকিৎসা চলতে থাকে, ততই ওর জ্বর বাড়তে থাকে। একদিন ওর পবিত্র আত্মা রক্ত-মাংসের খাঁচা ছেড়ে আসমানে উড়ে যায়।

__________________

বই: ফি বাত্বন আল-হূতি।
বাংলায়: মৃত্যুর বিছানায় [পৃষ্ঠা: ০৯-২১]
লেখক: ড. মুহাম্মাদ ইবনে আবদুর রহমান আরিফী।
উসতায, কিং সউদ ইউনিভার্সিটি, রিয়াদ।
কম্পোজ: ইসলামের পথ।

আমাদের ফেইসবুক পেইজ: www.facebook.com/islamerpath.page

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s